শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন
আবদুল আজিজ:
হামিদার প্রশ্ন: মুজিব বর্ষে প্রধানমন্ত্রী দেয়া ঘর কবে পাব?
হামিদা বেগম। বয়স জানা নেই তার। তবে বয়সের ভারে ন্যূয়ে পড়েছে হামিদা। এক ছেলে, দুই মেয়ে। স্বামী আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর সন্তানরাও ফেলে চলে গেছে। পরে অসহায় হামিদা বেগমের ঠাই হয় সাগর পাড়ের ঝাউ বাগানের ঝুঁপড়ি ঘরে। কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বরের মঞ্চ ঘেষে হামিদা বেগমের ঝুঁপড়ি ঘরটি। সেখানেই যুগ যুগ ধরে একাই বসবাস করে আসছেন হামিদা।
দিনের বেলায় পর্যটক সহ নানা মানুষের আনাগোনা থাকলেও রাতের অন্ধকারে নেমে আসে নিরবতা। সেই অন্ধকারের নিরবতায় নিরবে কাঁদে হামিদা। একদিকে নিরবতা অন্যদিকে সাগরের প্রচন্ড ঢেউর গর্জন। সেই সাগরের গর্জন শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হামিদা। হামিদা বেগমের ঝুঁপড়ি ঘরের ১০গজের মধ্যে আঁচড়ে পড়ছে সাগরের প্রবল ঢেউ। কিন্তু, বৃদ্ধা হামিদা সেই গর্জনে এখন ভয় পাই না। সাগরের সাথে যেন হামিদার মিথালী নিত্যদিনের। প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নানা ঘূর্ণিঝড়েও থেকে যায় তার ঝুঁপড়ি ঘরে। কেউ নেয় না হামিদার খবর।
হামিদা জানান, মুজিব বর্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘর উপহার পাচ্ছে অসহায় ও ভূমিহীন মানুষেরা। কিন্তু, কারা ভূমিহীন জানিনা। জানিনা এই সাগরপাড়ে কতদিন থাকতে হবে। জীবনের শেষ বয়সে এসে নতুন করে স্বপ্ন দেখছিলাম মুজিব বর্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহারের একখন্ড জমি নিয়ে ঘর পাব। কিন্তু, আমাকে কে দিবে ঘর। গত দুই বছর ধরে লকডাউনে খেয়ে না খেয়ে জীবন যায় আমার। কেউ কোনদিন এক মুঠো খাবারও দেয়নি।’
বৃদ্ধা হামিদা বেগম জানান, ‘ ১৯৯১ সালে রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ি থেকে কৌতুহল বশত পালিয়ে আসে কক্সবাজারে। সেই থেকে রয়ে যায় কক্সবাজারে। যাত্রাবাড়িতে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে আর ঢাকায় যাওয়া হয়নি তার। বিয়ে হয় সিলেটের আব্দুল মান্নানের সাথে। আব্দুল মান্নান কক্সবাজারের শতায়ু পরিষদের অল্প বেতনে পাহারাদারের চাকুরিরত অবস্থায় সে মারা যায়। এরপর এখন চাকুরিটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হামিদাকে দিয়েছেন শতায়ু পরিষদ কর্তৃপক্ষ। মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে হামিদার সংসার চলে না। মাঝেমধ্যে বের হয় ভিক্ষার থালি নিয়ে। ভিক্ষা করতে প্রথমে বিবেকে বাধলেও পরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। শতায়ু পরিষদের অল্প বেতন আর ভিক্ষার অনুদানে কোন রকমে চলে হামিদা বেগমের জীবন।’
কক্সবাজার পৌরসভার নাগরিক দাবি করে একটি ‘এনআইডি’ কার্ড দেখিয়ে বৃদ্ধা হামিদা বেগম জানান, ‘করোনা মহামারিতে একের পর এক লকডাউনে এখন ভিক্ষাও ঠিকমত দেয় না কেউ। এ পরিস্থিতিতে সরকারিভাবে কোন ধরণের সহযোগিতা পায়নি। কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র/কাউন্সিলরদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন অনুদান না পাওয়ায় ক্লান্ত হামিদা। তাদের কাছে একাধিকবার গেলেও এক মুঠো চাউল পায়নি হামিদা।’
হামিদার ভাষ্যমতে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসলে একাধিক ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় সাগরে। ঘূর্ণিঝড় যখন প্রবল আকারে রূপ নেয়, তখনও সে সাগরপাড়ে রয়ে যায়। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তার। এসময় কেউ খবরও নেয় না। সম্প্রতি সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ইয়াস প্রবলভাবে রূপ নিলেও সেই সৈকত পাড়ের কবিতা চত্বরের ঝুঁপড়ি ঘরেই ছিল। কোথাও যায়নি। তার সেই ঝুঁপড়ি ঘরটি আপন ঠিকানা। হামিদা জানান, মরে গেলে তো কেউ বাঁচাতে পারবে না। একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে বাকি জীবন অতিবাহিত করবেন সে।’
হামিদা জানান, ‘জীবনদশায় স্বপ্ন ছিল এক টুকরো জমি। যে জমিতে মৃত্যু হলেও আত্মা শান্তি পাবে। অন্তত তার সন্তানরা বলছে পারবে এই জমি তাদের মায়ের ছিল। কিন্তু, সেই স্বপ্নকি পূরণ হবে? প্রশ্ন রাখেন হামিদা।
লকডাউনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সংগঠনের নানা ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে গিয়ে ফেরত আসার কথা জানিয়ে হামিদা বেগম জানান, কোন ধরণের ত্রাণ তো দূরের কথা, এক মুঠো চাউলও পাননি।
এদিকে, মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার নতুন ঘর পাচ্ছে দ্বিতীয় দফায় কক্সবাজার জেলার আরও ১৪২৩টি ভূমিহীন গৃহহীন পরিবার। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সিংর মাধ্যমে রোববার আশ্রয়ণ ২ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় ধাপে ভূমিহীন, গৃহহীন এসব পরিবারকে বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ সেমি পাকা ঘর প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।
শুক্রবার (১৮ জুন) জেলা প্রশাসন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ। এই প্রকল্পের আওতায় ১ম পর্যায়ে এর আগে আরও ৩০৩ টি পরিবার নতুন বাড়তি পেয়েছে। ২০ জুন ১০১৮ পরিবারকে নতুন ঘর হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া আগামী ৩০ জুনের মধ্যে আরও ১০২ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে বিনামূল্যে জমিসহ ঘর প্রদান করা হবে। এ নিয়ে জেলায় মোট ১৪২৩টি গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল বাংলার গরীব-দুঃখীদের মুখে হাসি ফোটাবার। তাই “মুজিববর্ষে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না” প্রধানমন্ত্রী এই মহতী স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরের লক্ষ্যে খাস জমি বন্দোস্ত করে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য গৃহ নির্মাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিগত ২৩ জানুয়ারি ১ম পর্যায়ে ৩০৩টি গৃহ ও ভূমিহীন পরিবারকে ঘর দেয়া হয়েছে। ২য় পর্যায়ে মোট ১০১৮টি পরিবার পাবে নতুন ঘর।
ভয়েস/জেইউ।